বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশ আমেরিকাতেও নির্বাচনের সময় বহু রাজ্যে এখনও কাগজের ব্যালট ব্যবহার করা হয়। ভারতে যেখানে দেশজুড়ে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) এবং VVPAT ব্যবস্থা চালু রয়েছে, সেখানে আমেরিকায় রাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ম অনুযায়ী ভোটগ্রহণের পদ্ধতি আলাদা।

আমেরিকায় গোটা দেশের জন্য একটিমাত্র ভোটদান পদ্ধতি নেই। কিছু রাজ্যে মূলত কাগজের ব্যালট ব্যবহার করা হয়, আবার কিছু জায়গায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন কিংবা দুই ব্যবস্থার সমন্বয় দেখা যায়। পাশাপাশি আগাম ভোটদান এবং ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

ব্যালট পেপার নাকি EVM—আমেরিকায় কোনটি ব্যবহার হয়?

আমেরিকার বহু এলাকায় ভোটাররা কাগজের ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্দিষ্ট চিহ্ন দেন। এরপর সেই ব্যালট ব্যালট বাক্সে জমা দেওয়া হয় অথবা স্ক্যানার মেশিনের মাধ্যমে গণনা করা হয়। প্রয়োজনে পুনর্গণনা ও নিরীক্ষার জন্য কাগজের রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়।

কিছু এলাকায় Direct Recording Electronic (DRE) ভোটিং মেশিন ব্যবহার করা হয়। এই ব্যবস্থায় ভোটাররা ইলেকট্রনিক স্ক্রিনে পছন্দের প্রার্থী নির্বাচন করেন এবং ভোট ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত হয়। কিছু মেশিনে যাচাই ও নিরীক্ষার সুবিধার জন্য কাগজের রেকর্ডও তৈরি হয়।

তাই আমেরিকার নির্বাচনকে সম্পূর্ণ ব্যালট পেপার-নির্ভর অথবা সম্পূর্ণ EVM-নির্ভর বলা ঠিক হবে না। রাজ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ম অনুযায়ী ভোটদানের পদ্ধতি বদলে যায়।

আমেরিকায় কীভাবে ভোটগ্রহণ হয়?

১. ভোটার নিবন্ধন

অধিকাংশ রাজ্যে ভোট দেওয়ার আগে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করতে হয়। সাধারণত ভোটারকে মার্কিন নাগরিক হতে হয়, নির্বাচনের দিন তাঁর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বসবাসের শর্ত পূরণ করতে হয়। তবে North Dakota-তে ভোটার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়।

২. ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি

নির্বাচনের দিন ভোটাররা নিজেদের নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রে যান। নির্বাচনী আধিকারিকরা ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম ও নিবন্ধনের তথ্য যাচাই করেন। পরিচয়পত্র সংক্রান্ত নিয়ম রাজ্যভেদে আলাদা। কিছু রাজ্যে ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র প্রয়োজন হয়, আবার কিছু রাজ্যে অন্য নথির মাধ্যমেও পরিচয় যাচাই করা যায়।

৩. ভোট দেওয়ার পদ্ধতি

যেখানে কাগজের ব্যালট ব্যবহার করা হয়, সেখানে ভোটাররা পছন্দের প্রার্থীর পাশে নির্দিষ্ট চিহ্ন দিয়ে ব্যালট জমা দেন। অনেক জায়গায় স্ক্যানার মেশিনের সাহায্যে এই ব্যালট গণনা করা হয়।

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন থাকা কেন্দ্রে ভোটাররা স্ক্রিনে পছন্দের প্রার্থী নির্বাচন করেন। মেশিনে ভোট ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত হয়। কিছু ব্যবস্থায় কাগজের রেকর্ডও তৈরি করা হয়।

৪. আগাম ভোটদান ও ডাকযোগে ভোট

আমেরিকায় ভোট দেওয়ার জন্য শুধুমাত্র নির্বাচনের দিনের অপেক্ষা করতে হয় না। বহু রাজ্যে নির্ধারিত দিনের আগেই ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যের নিয়ম মেনে ডাকযোগেও ভোট দেওয়া যায়।

ডাকযোগে আসা ব্যালট নির্বাচনী আধিকারিকরা যাচাই করেন। রাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী স্বাক্ষর এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য পরীক্ষা করার পরই ব্যালট গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আমেরিকায় কীভাবে ভোট গণনা হয়?

ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর স্থানীয় নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ ব্যালট এবং ইলেকট্রনিক ভোটের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ শুরু করে। কাগজের ব্যালট হাতে গোনা হয় অথবা স্ক্যানার মেশিনের সাহায্যে গণনা করা হয়। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে সংরক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভোট গণনা করা হয়।

নির্বাচনের রাতেই প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশিত হতে শুরু করে। তবে এই ফলাফল সবসময় চূড়ান্ত নয়। ডাকযোগে আসা ব্যালট, আগাম ভোট এবং বিদেশে বা সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ভোটারদের ভোট গণনা করতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।

এরপর নির্বাচনী আধিকারিকরা Canvassing প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমা পড়া ব্যালটের সংখ্যা এবং ভোটারদের নথির মধ্যে মিল পরীক্ষা করেন। কোনও অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়। রাজ্যের আইন অনুযায়ী নিরীক্ষা বা পুনর্গণনাও হতে পারে। প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করা হয়।

আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মার্কিন প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাকে মিডটার্ম নির্বাচন বলা হয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমেরিকার কংগ্রেসের দুই কক্ষের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হয়। কংগ্রেসের দুটি কক্ষ হল—House of Representatives এবং Senate।

House of Representatives-এর ৪৩৫টি আসনের সবকটিতে প্রতি দুই বছর অন্তর নির্বাচন হয়। অন্যদিকে Senate-এর মোট ১০০টি আসনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে প্রতি দুই বছর অন্তর ভোট হয়। একজন সেনেটরের মেয়াদ ছয় বছর।

২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মিডটার্ম নির্বাচনে House of Representatives-এর ৪৩৫টি এবং Senate-এর ৩৫টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

আজকের ফলাফলে কী ঘটল?

Associated Press-এর ৪ নভেম্বরের আপডেট অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য এই ফলাফল বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Kansas, Iowa, Texas, Ohio, Maine, North Carolina এবং South Carolina-র মতো রাজ্যে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসন ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের দখলে এনেছে। AP-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, House of Representatives-এও ডেমোক্র্যাটরা দুই ডজনের বেশি আসন পেয়েছে।

এই ফলাফলের ফলে ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছর রাজনৈতিকভাবে আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকায় তাঁরা আইন প্রণয়ন আটকে দিতে, প্রশাসনের কাজকর্মের তদন্ত করতে এবং সরকারি নিয়োগের অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন।

নির্বাচনের সময় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ এবং সরকারি দুর্নীতি ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।

ভারতের EVM এবং আমেরিকার ভোটদান ব্যবস্থার পার্থক্য

ভারতে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে দেশজুড়ে EVM এবং VVPAT ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আমেরিকায় একক কোনও জাতীয় ভোটদান ব্যবস্থা নেই। সেখানে রাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসন নিজেদের নিয়ম অনুযায়ী কাগজের ব্যালট, ইলেকট্রনিক মেশিন, আগাম ভোটদান এবং ডাকযোগে ভোটের ব্যবস্থা পরিচালনা করে।

ভারতে ভোটাররা EVM-এর মাধ্যমে ভোট দেন এবং VVPAT-এর সাহায্যে কাগজের স্লিপ দেখে নিজেদের ভোট যাচাই করতে পারেন। আমেরিকার বহু এলাকায় ভোটাররা সরাসরি কাগজের ব্যালটে চিহ্ন দেন। পরে সেই ব্যালট স্ক্যান করে গণনা করা হয়। প্রয়োজনে এই কাগজের নথির ভিত্তিতে নিরীক্ষা ও পুনর্গণনা করা সম্ভব।